মুহতারাম মুফতি সাহেব,
আসসালামু আলাইকুম ।
অনুগ্রহপূর্বক আমার দীর্ঘ এই প্রশ্নের উত্তর জানিয়ে বাধিত করবেন, ইনশা আল্লাহ ।
আমি দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সোরিয়াসিস নামক চর্মরোগে ভুগছি । অনেকে এটিকে সোরাইসিস উচ্চারণেও বলে থাকেন । এটি একজিমাও নয়, দাদরোগও নয়, শ্বেতী রোগও নয় ।
এই রোগটি একটি অটো-ইমিউন রোগ যেখানে আমার শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আমার শরীরেরই চামড়ার বিভিন্ন অংশকে আক্রমণ করছে যা বাহ্যিকভাবে দেখা যাচ্ছে । কিন্তু শরীরের ভেতরেও এটি সমস্যা তৈরি করছে যা আপাতত বোঝা যাচ্ছে না ।
বর্তমানে আমার হাঁটু, কনুই, চোখের ভ্রূ, কপাল, হাতের পৃষ্ঠদিকে বিভিন্ন আকার আকৃতিরর চাকা / চাকতির মত গঠন (patch) তৈরি হয়েছে, মাথাতেও আছে । হাঁটুর নিচে দুই পায়ের নলার চামড়ায় এবং কুঁচকিতে বড় বড় কয়েকটি patch আছে ।
এমনকি এ বছরে এটি লিঙ্গের গোড়ায়, অগ্রভাগে, মূত্রনালির মুখের কাছে ও অন্ডথলিতেও বিস্তৃত হয়েছে ।
বিগত ৯ বছরে রোগটি যতটা বিস্তৃত হয়েছিল, বিগত ২ মাসে প্রায় তার সমপরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং রোগটির বৃদ্ধি এখনো অব্যাহত আছে ।
এই patch গুলো প্রতিদিন বিভিন্ন সময়ে খুবই চুলকায়, খুশকির মত উঠে, সামান্য চুলকানোর ফলেই রক্তপাত হয় । না চুলকিয়েও পারা যায় না । রক্ত ধুয়ে মুছে ফেললেও আঠালো রসের মত আসতে থাকে । এসবের দ্বারা প্রতিনিয়তই প্রচুর কাপড় ময়লা করি, বিছানার চাদর ময়লা করি, নাপাক করে ফেলি । বাসার লোকজনও কমবেশি বিরক্ত এসব পরিস্কার করতে করতে ।
বর্তমানে এই অসুস্থতা আমার দৈনন্দিন ইবাদত বন্দেগি, পাক-পবিত্রতা, মানসিক শান্তি, শরীরের স্বস্তি সবকিছুকেই গুরুতরভাবে প্রভাবিত করেছে ।
এই রোগের চিকিৎসা না করালে এটি একসময় হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্রোনিক কিডনি রোগ, টাইপ-২ ডায়বেটিস, ফ্যাটি লিভার, অস্থিসন্ধির ক্ষতি ইত্যাদির কারণ হয়ে থাকে । এটি বিভিন্ন গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে ।
ইদানিং আমার হাত, মুখ এগুলো দেখে কেউ বিস্ময়ে বা কেউ হয়ত গোপন ঘৃণায় জিজ্ঞাসা করে যে কী হয়েছে আমার ।
আমি বিগত সাড়ে ৯ বছরে বিভিন্ন অ্যালোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক, কবিরাজি (ভেষজ) চিকিৎসাও করিয়েছি ।
অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তাররা শুরু থেকেই বলেন যে, এই রোগ সারে না, নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় সারাজীবন ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা এত ধীরগতির যে, এর থেকে কাংক্ষিত ফলাফল পেয়েছি বলে কখনো মনে হয়নি ।
উপরন্তু, হোমিওপ্যাথিক মেডিসিনে অ্যালকোহল থাকে আর অ্যালোপ্যাথিক অনেক মেডিসিনে জেলাটিন ব্যবহার করা হয় যেটার উৎস হালাল না কী হারাম (শুকর/ মৃত প্রাণী) সেটাও জানা যায় না ।
এসব কারণে আগে আমি সোরিয়াসিস চিকিৎসার অনেক ওষুধই খাইনি, খেলে কী হত তাও জানি না । যেহেতু, চিকিৎসকদের দিক থেকেই অভিজ্ঞতালব্ধ কোন নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি সুস্থতার বিষয়ে ।
বর্তমানে, কয়েক বছর ধরে ন্যাচারোপ্যাথি বলে চিকিৎসার একটি ধারা বেশ জনপ্রিয় হয়েছে । এখানে, কৃত্রিম পরিবেশের স্টেরয়েড, অ্যান্টিবায়োটিক যুক্ত খাবার-দাবার না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, স্বাভাবিক পরিবেশে জন্মানো খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় ৷ সেই সাথে বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেল সাপ্লিমেন্ট খেতে দেওয়া হয় ৷
আমেরিকা প্রবাসী ডঃ মুজিবুল হক -এর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে পরিচালিত আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টার (awc) -এই ন্যাচারোপ্যাথি ধারার একটি প্রতিষ্ঠান । উল্লিখিত ডক্টর বিভিন্ন প্রচারণা মাধ্যমে জোরালোভাবে দাবী করছেন এবং রোগীদের সাক্ষাৎকারও প্রচার করছেন, যেখানে তার বিগত ১১ বছরের অভিজ্ঞতায় সোরিয়াসিসের প্রত্যেক রোগী সুস্থ হয়েছেন, অনেকে চিকিৎসা শুরু করার দুই তিন মাসের মধ্যেই সুস্থ হয়েছেন এবং সুস্থ আছেন । একজনের ২২ বছরের পুরনো সোরিয়াসিস সেরে গিয়েছে ।
তিনি তার আমেরিকান সাপ্লিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান (Integmed) -এ ব্যবহৃত সাপ্লিমেন্টগুলোকে হালাল বলছেন যেগুলো বাংলাদেশে সোরিয়াসিস চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে ৷
আমি ঢাকাস্থ awc -তে যোগাযোগ করলে তারা বেশ কিছু থেরাপি, ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট আমাকে ব্যবহার করতে বলেন । তবে এর মধ্যে ৪টি ওষুধ ইন্টেগমেডের তৈরি নয় ।
এর মধ্যে সোরিয়াসিসের অবশ্য ব্যবহার্য ওষুধস্বরূপ যেটা তারা ব্যবহার করেন সেটা হল -
Dermatrophin PMG. এটি আমেরিকার একটি মাত্র কোম্পানি তৈরি করে, এটার সমমানের কোন বিকল্প সাপ্লিমেন্ট বাজারে পাওয়া যায় না । এই সাপ্লিমেন্টটি মৃত গরুর চামড়ার আবরণী কোষ থেকে তৈরি করা হয় ।
যেহেতু, আমেরিকান প্রতিষ্ঠান সেহেতু হালাল না হবার সম্ভাবনাই প্রবল উপরন্তু নিজ উদ্যোগেও উৎপাদনকারীরাও এটিকে হালাল সার্টিফাইড বলে না ।
অন্য তিনটি ওষুধ বাংলাদেশের ক্যাপসুল । একটি স্কয়ারের ভিটামিন D3K2, আরেকটি ইবনে সিনার ক্যাপসুল নিমি (নিম নির্যাস) এবং আরেকটি হল বিভিন্ন কোম্পানির ই-ক্যাপ (ভিটামিন ই ক্যাপসুল) ।
বাংলাদেশের এসব ক্যাপসুলের জেলাটিন শেল -এর সমস্যা হল এরা ব্যংলাদেশের একমাত্র হালাল জেলাটিন শেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ক্যাপসুল লিমিটেড বাদেও চাইনিজ, ভিয়েতনামিজ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আমদানিকৃত জেলাটিন ব্যবহার করে । ফলে, এগুলো সন্দেহজনকের আওতায় পড়ে যাচ্ছে ।
দু-তিনটা কোম্পানিকে ইমেইল করেছিলাম এ বিষয়ে, তারা ইমেইল দেখেছেন কী না জানি না । উত্তরও পাইনি ।
ই-ক্যাপের বিকল্প হালাল কিছু বিদেশি সাপ্লিমেন্ট আছে যেগুলোর ডোজ আমার জন্য প্রযোজ্য ডোজের সাথে পুরোপুরি মিলে না । আবার, বাংলাদেশি একটা ক্যাপসুল যেখানে ৫-১০ টাকা দাম, সেসবের হালাল বিকল্পের দাম প্রতি পিস ৬০ টাকা বা এর কাছাকাছি ।
ইবনে সিনার ক্যাপসুল নিমির দেশি বিদেশি কোন বিকল্প খুঁজে পাইনি ।
অনেক সময় এসব ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও দ্বীনদার ডক্টরের পরামর্শ মেনে চলার কথা শুনেছি ।
কিন্তু, আমাদের সমাজে যাঁরা দ্বীনদার তাঁরা সবাই ডক্টর নন, আর যাঁরা ডক্টর তাঁরা সবাই দ্বীনদার নন । বড়জোর প্র‍্যাক্টিসিং মুসলিম হলেও তাঁরা সবাই সোরিয়াসিস বিশেষজ্ঞও নন ।
মুফতি সাহেব, আমার এ অবস্থায় করণীয় কী? আমার আশঙ্কা হয় যে আমার ধৈর্যের সীমা হয়ত আর কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে যাবে । আমার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার মত অবস্থা হয়েছে । আমার চেষ্টা অনুযায়ী আর কোন দুনিয়াবী চিকিৎসার অপশন আমার জানা নেই ।
যেহেতু, awc তাদের চিকিৎসার শতভাগ সাফল্য প্রকাশ্যে ঘোষণা করছে, তাদের কোন সোরিয়াসিস রোগী পুনরায় আক্রান্ত হননি - এটাও তাদের ডক্টরের মুখেই শুনেছি ।
Dermatrophin PMG, ইক্যাপ, ক্যাপসুল D3K2 ও ক্যাপসুল নিমি- এই চারটি ওষুধের সীমাবদ্ধতা ও বিদ্যমান সমস্যা উপরে উল্লেখ করেছি ।
এখন, আমার সামগ্রিক অবস্থা ও উপরের সব বর্ণনা বিবেচনায়-
১) তাদের প্রেসক্রিপশনে উল্লিখিত ওষুধ - Dermatrophin PMG, ক্যাপসুল D3K2, ক্যাপসুল নিমি ও ইক্যাপ - আমি সেবন করতে পারব কী না?
২) যদি সেবন করতে পারি তবে ওষুধগুলো খাওয়ার পরে আমাকে কুলি করে মুখ পরিষ্কার করতে হবে কী না?