আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমার একটি শারীরিক ব্যায়াম সংক্রান্ত প্রশ্ন ছিল। ব্যায়ামটির নাম "হিন্দু পুশ-আপ" (Hindu Push-up), যাকে দেশীয় পরিভাষায় কুস্তিগীরদের "ডান্ড" (Dand) বলা হয়। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই এটিকে 'ইয়োগা' (Yoga) বা 'সূর্য নমস্কার'-এর অংশ মনে করে। যেহেতু ইসলামি শরীয়তে অন্য ধর্মের উপাসনামূলক বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস জড়িত 'ইয়োগা' করা হারাম, তাই আমি এই ব্যায়ামটির ঐতিহাসিক উৎপত্তি নিয়ে কিছু ঘাটাঘাটি করেছি। যে বিষয়গুলো পেয়েছি: ১. আদি উৎস: ঐতিহাসিকভাবে এটি মোটেও ধ্রুপদী ইয়োগা (Classical Yoga) নয়। এটি শত শত বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের কুস্তিগীর বা পালোয়ানদের নিজস্ব শারীরিক কসরত। তারা কেবল শারীরিক শক্তি, ক্ষিপ্রতা ও স্ট্যামিনা বাড়াতে এটি করতো। ২. ইয়োগার সাথে মিশ্রণ: প্রাচীন ইয়োগার আসনগুলো ছিল সম্পূর্ণ স্থির এবং ধ্যানের জন্য। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে (১৯৩০-এর দশকে) আধুনিক ইয়োগা গুরুরা শারীরিক ফিটনেস বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পালোয়ানদের এই দ্রুতগতির 'ডান্ড' বা পুশ-আপকে আধুনিক ইয়োগার (বিশেষ করে সূর্য নমস্কারের ফ্লো-তে) ভেতর ঢুকিয়ে ফেলে। ফলে সাধারণ মানুষ ভুলবশত একে ইয়োগার অংশ ভাবতে শুরু করে। ৩. ব্যায়ামের ধরন: এটি মূলত সাধারণ পুশ-আপের মতোই, তবে একটু ভিন্নভাবে শরীর নিচু করে তরঙ্গের মতো ওঠানামা করতে হয়। এর সাথে কোনো মন্ত্র পাঠ, সূর্য পূজা, চক্র জাগরণ বা আধ্যাত্মিক ধ্যানের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পর্ক নেই। এটি সম্পূর্ণ একটি ডায়নামিক পেশী গঠনের ব্যায়াম। ৪. উপকারিতা: বর্তমানের ডেস্কে বসে থাকা জীবনের কারণে সৃষ্ট মেরুদণ্ড ও কাঁধের ব্যথা দূর করতে এবং আপার বডির শক্তি বৃদ্ধিতে এটি বৈজ্ঞানিকভাবে খুবই কার্যকরী। গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা পুশ-আপ হিসেবে এই হিন্দু পুশাপ/ডান্ড করে থাকে। কাবাডি, কুস্তি যারা খেলে তারা সবাই এই ব্যায়াম করে থাকে অনেক আগে থেকেই। ৫. নামকরণ: এই ব্যায়ামের নামকরণের কারণে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মূলত এই ব্যায়ামের নাম হচ্ছে Dand (এ নামকরণের ইতিহাসও ব্যায়ামের সাথে সম্পৃক্ত)। পশ্চিমা গবেষকরা এই ব্যায়ামের নাম দেন হিন্দু পুশ-আপ (যেমনটা আরো অনেক ব্যায়ামের ক্ষেত্রে দিয়েছেন। যেমনঃ বুলগেরিয়ান স্কোয়াট, যা একটা নির্দিষ্ট দেশ/অঞ্চল/জাতির সাথে সম্পৃক্ততার কারনে দেওয়া হয়েছে) আমার জানার বিষয় হলো: যেহেতু এই ব্যায়ামটির মূল উৎপত্তি কুস্তিগীরদের শারীরিক কসরত থেকে (কোনো ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক ইয়োগা থেকে নয়), এবং আমি সম্পূর্ণ সুস্থতা, পেশীর শক্তি বৃদ্ধি ও ফিটনেসের নিয়তে, কোনো প্রকার মন্ত্র বা বিধর্মীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়া কেবল একটি সাধারণ ব্যায়াম হিসেবে এটি করতে চাই, সেহেতু ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে আমার জন্য এই "ডান্ড" বা হিন্দু পুশ-আপ করা জায়েজ হবে কি? জাযাকাল্লাহু খাইরান।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার দেওয়া বিস্তারিত তথ্য এবং আপনার নিয়ত অনুযায়ী, ইনশাআল্লাহ, আপনি সুস্থতা ও শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার ধর্মীয় বিশ্বাস বা অনুষঙ্গ ছাড়া এই "ডান্ড" বা "হিন্দু পুশ-আপ" ব্যায়ামটি করতে পারবেন। এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে
জায়েজ।
যুক্তি ও কারণ:
১.
নিয়তের গুরুত্ব: ইসলামে সকল কাজের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। হাদীসে এসেছে:
"إنما الأعمال بالنيات، وإنما لكل امرئ ما نوى"
অর্থ: "নিশ্চয়ই আমলসমূহ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করবে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস ১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯০৭)
যেহেতু আপনার নিয়ত সম্পূর্ণ শারীরিক সুস্থতা ও পেশী শক্তিশালী করা, এবং আপনি এর সাথে কোনো বিধর্মীয় উপাসনা, মন্ত্রপাঠ, সূর্য পূজা, চক্র জাগরণ বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস যুক্ত করছেন না, তাই এর মূল উৎস বা পরবর্তীকালে এর সঙ্গে যোগ হওয়া অনুষঙ্গগুলো আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
২.
ব্যায়ামের ঐতিহাসিক উৎস: আপনার গবেষণায় এটি স্পষ্ট যে, এই ব্যায়ামটির মূল উৎপত্তি ভারতীয় উপমহাদেশের কুস্তিগীরদের শারীরিক কসরত হিসেবে, যা শত শত বছর ধরে শারীরিক শক্তি ও ক্ষিপ্রতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি মূলত কোনো ধ্রুপদী যোগাসন বা উপাসনালব্ধ ক্রিয়া ছিল না। এটি একটি বিশুদ্ধ শারীরিক কসরত ছিল।
৩.
আধুনিক যোগার সাথে মিশ্রণ: পরবর্তীকালে বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক যোগগুরুরা এটিকে শারীরিক ফিটনেসের উদ্দেশ্যে যোগার ফ্লো-তে (যেমন সূর্য নমস্কার) অন্তর্ভুক্ত করলেও, এর দ্বারা ব্যায়ামটির মূল বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়ে যায় না যদি ব্যক্তি তা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে না করে। অনেক শারীরিক ক্রিয়াই বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে। একটি কাজ কখন জায়েজ বা নাজায়েজ হবে, তা নির্ভর করে কাজটি কোন উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে এবং এর সাথে কোন ধর্মীয় বিশ্বাস জড়িত আছে কি না তার ওপর।
৪.
শারীরিক উপকারিতা ও উৎসাহ: শারীরিক সুস্থতা অর্জন ইসলামের একটি প্রশংসনীয় বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিমদের শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান হতে উৎসাহিত করেছেন। এই ব্যায়ামটি বৈজ্ঞানিকভাবে মেরুদণ্ড ও কাঁধের ব্যথা দূর করতে এবং আপার বডির শক্তি বৃদ্ধিতে খুবই কার্যকরী, যা স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্তর্ভুক্ত।
৫.
নামকরণের বিভ্রান্তি: 'হিন্দু পুশ-আপ' নামটি কেবল একটি ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক সংশ্লিষ্টতা নির্দেশ করে (যেমন 'বুলগেরিয়ান স্কোয়াট'), যা এর ধর্মীয় প্রকৃতির ইঙ্গিত দেয় না যদি না এর সাথে ধর্মীয় কোনো কাজ বা বিশ্বাস জড়িত থাকে।
তবে, এই ব্যায়ামটি করার সময় আপনাকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে:
- আপনার নিয়ত কেবল শারীরিক সুস্থতা ও শক্তি বৃদ্ধি হবে, কোনো অবস্থাতেই কোনো বিধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনার অংশ হিসেবে নয়।
- এর সাথে কোনো মন্ত্র পাঠ, সূর্য পূজা বা অন্য কোনো বিধর্মীয় আধ্যাত্মিক চর্চা করা যাবে না।
- এমন কোনো পোশাক বা অনুষঙ্গ পরিধান করা যাবে না যা সরাসরি বিধর্মীয় ধর্মীয় প্রতীক বা উপাসনার অংশ হিসেবে পরিচিত।
সংক্ষেপে, যেহেতু এই ব্যায়ামটি এর মৌলিক রূপে একটি শারীরিক কসরত এবং আপনি এটিকে শুধুমাত্র শারীরিক সুস্থতার উদ্দেশ্যে, কোনো ধর্মীয় অনুষঙ্গ ছাড়া করতে চান, তাই এটি শরীয়ত অনুযায়ী জায়েজ।
আল্লাহ তা'আলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমীন।