১. ব্যাংকের জন্য ল্যাপটপ, কম্পিউটার, প্রিন্টার ইত্যাদি কেনার প্রয়োজন হলে সাপ্লায়ারদের সাথে যোগাযোগ করা, দরদাম করা এবং সেগুলো ক্রয় করার ব্যবস্থা করা। অর্থাৎ শুধু যন্ত্রপাতি কেনা-কাটার সমন্বয় করা। ২. ব্যাংকের ইন্টারনেট কানেকশন যারা দেয় (আইএসপি বা সার্ভিস প্রোভাইডার), তাদের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং ব্যাংকের ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সিস্টেম ঠিকভাবে চলছে কি না তা মনিটর করা। উল্লেখ্য, এই কাজগুলোর সাথে সরাসরি সুদের হিসাব, সুদের সফটওয়্যার তৈরি, সুদের চুক্তি লেখা বা সুদের লেনদেনের কোনো কাজ জড়িত থাকবে না। এ ধরনের কাজ যদি কেউ সুদি ব্যাংকে চাকরি হিসেবে করে, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তা করা জায়েজ বা হালাল হবে কি না? ? বিদ্রঃএই প্রশ্নের উত্তর ২জন মুফতি ২রকম দিয়েছেন ,একজন বলেছেন জায়েজ হবে, অন্য জন বলেছেন জায়েজ হবে না, তাহলে কোন উত্তর টা নিবো??
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নটির উত্তর কিছুটা সূক্ষ্ম এবং এ কারণেই সম্মানিত মুফতিদের মাঝে মতপার্থক্য দেখা যেতে পারে। তবে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও প্রামাণ্য মত অনুযায়ী, আপনার উল্লেখিত কাজগুলো সুদি ব্যাংকে চাকরি হিসেবে করা জায়েজ বা হালাল হবে।
বিশ্লেষণ:
১.
মূল নীতি: ইসলামে সুদ (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম। সুদের লেনদেন, সুদ লেখা, সুদের হিসাব করা, সুদের সাক্ষী হওয়া - এ সবই হারাম এবং এতে জড়িত ব্যক্তিরা গুনাহগার।
২.
আপনার কাজের প্রকৃতি:
* আপনি ল্যাপটপ, কম্পিউটার, প্রিন্টার ইত্যাদি কেনার ব্যবস্থা করছেন।
* আপনি ইন্টারনেট কানেকশন ও প্রযুক্তিগত সিস্টেম মনিটর করছেন।
* সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে,
"এই কাজগুলোর সাথে সরাসরি সুদের হিসাব, সুদের সফটওয়্যার তৈরি, সুদের চুক্তি লেখা বা সুদের লেনদেনের কোনো কাজ জড়িত থাকবে না।"
৩.
হানাফি মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি:
* হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতে, যদি কাজের মূল প্রকৃতি স্বয়ং হারাম না হয় এবং কর্মচারী সরাসরি হারাম লেনদেনে অংশগ্রহণ না করে, তবে কাজটি জায়েজ হতে পারে, এমনকি যদি প্রতিষ্ঠানটি হারাম লেনদেনের সাথে জড়িত থাকে।
* আপনার কাজগুলো (আইটি সরঞ্জাম কেনা, ইন্টারনেট মনিটর করা) স্বয়ং হারাম নয়। এই কাজগুলো যেকোনো হালাল প্রতিষ্ঠানেও করা যেতে পারে।
* আপনি সুদের হিসাব, চুক্তি লেখা বা সরাসরি সুদের লেনদেনে জড়িত হচ্ছেন না। আপনি পরোক্ষভাবে একটি সুদি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো তৈরিতে সাহায্য করছেন, যা সরাসরি হারাম কাজে সহযোগিতা নয়। ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় একে "মু'আওয়ানাতুন গায়রে মুবাশিরাহ" বা "অপ্রত্যক্ষ সহযোগিতা" বলা হয়।
*
উদাহরণ: একজন কর্মচারী যদি ব্যাংকের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত কাগজ, কলম, আসবাবপত্র কেনা বা ব্যাংক ভবন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত থাকেন, তবে তার কাজ হারাম হবে না। কারণ, এসব কাজ স্বয়ং হালাল এবং তিনি সরাসরি সুদের লেনদেনে জড়িত নন। আপনার কাজটিও এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত।
৪.
কুরআন ও হাদিসের আলোকে:
* কুরআনে সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলা হয়েছে এবং সুদ গ্রহণকারী, প্রদানকারী, লেখক ও সাক্ষী— এদের সবাইকে সমানভাবে গুনাহগার বলা হয়েছে। আপনার কাজ সরাসরি এই চারটি ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত নয়।
* হাদিসে (যেমন, মুসলিম শরিফ) রাসূলুল্লাহ (সা.) লানত করেছেন সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের লেখক এবং এর সাক্ষীগণকে। তিনি বলেছেন, "এরা সবাই সমান।" আপনার উল্লেখিত কাজগুলো সরাসরি এই লানতপ্রাপ্ত কাজের মধ্যে পড়ে না।
দুইজন মুফতির ভিন্ন মতামতের কারণ এবং কোন উত্তরটি গ্রহণ করবেন:
- যারা 'না-জায়েজ' বলেছেন: সম্ভবত তারা "হারাম কাজে পরোক্ষ সহযোগিতা" (মু'আওয়ানাতুন আলাল ইছম) নীতিটিকে খুব কঠোরভাবে দেখেছেন। তাদের যুক্তি হতে পারে যে, আপনার কাজগুলো সুদি ব্যাংককে তার সুদি কার্যক্রম চালাতে সাহায্য করছে, তাই এটি হারাম।
- যারা 'জায়েজ' বলেছেন (প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত): তারা হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ নীতি অনুযায়ী প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। যেহেতু আপনার কাজ স্বয়ং হারাম নয় এবং আপনি সরাসরি সুদের লেনদেনে জড়িত নন, তাই এটি জায়েজ।
উপসংহার ও পরামর্শ:
আপনার প্রশ্নের শর্তগুলো (সরাসরি সুদের হিসাব, সফটওয়্যার, চুক্তি বা লেনদেনে জড়িত না থাকা) বিবেচনা করলে,
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও অধিকাংশ মুফতিদের মতে, আপনার উল্লেখিত কাজগুলো সুদি ব্যাংকে চাকরি হিসেবে করা জায়েজ বা হালাল হবে।
যখন দুইজন মুফতির দুটি ভিন্ন মতামত থাকে, তখন সাধারণত ফতোয়া বোর্ড বা সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্ভরযোগ্য মুফতিদের মতামত গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রে, হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহের আলোকে 'জায়েজ' হওয়ার মতটিই অধিকতর শক্তিশালী এবং গ্রহণযোগ্য।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
যদিও শরীয়তের দৃষ্টিতে এই কাজটি জায়েজ, কিন্তু তাকওয়া (আল্লাহভীতি) এবং আত্মিক প্রশান্তির জন্য সবসময় সুদবিহীন বা হালাল প্রতিষ্ঠানে কাজ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। যদি সুযোগ থাকে, তবে যেকোনো হালাল ও সুদবিহীন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরিত হওয়ার চেষ্টা করা উত্তম।