ইফাতওয়া.ইনফো এর নীতিমালা এবং হানাফি মাযহাবের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, মুসলিমদের জন্য "ধ্যান" বা মেডিটেশনের যেসব পদ্ধতি জায়েজ, সেগুলোর মূল ভিত্তি হলো ইসলামী ইবাদত এবং আল্লাহ তায়ালার স্মরণ (ধিকির) ও তাঁর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা। ইসলামী শরিয়ত-বিরোধী কোনো ধ্যান বা মেডিটেশন জায়েজ নয়।
জায়েজ কয়েকটি ইসলামী মেডিটেশনের নাম বা ধরন নিচে উল্লেখ করা হলো:
1.
ধিকির (আল্লাহর স্মরণ): এটি ইসলামী মেডিটেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক রূপ। আল্লাহর নাম, গুণাবলী বা কালেমা স্মরণ করা (যেমন: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার) মৌখিকভাবে বা নীরবে করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে অন্তর প্রশান্ত হয় এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর হয়।
*
পদ্ধতি: নিরিবিলি পরিবেশে বসে মনকে আল্লাহ তায়ালার স্মরণে নিবিষ্ট করা। এটি তাসবীহ হাতে নিয়েও করা যেতে পারে।
*
উদ্দেশ্য: মানসিক শান্তি, আত্মিক পরিশুদ্ধি, আল্লাহর নৈকট্য লাভ।
2.
তাফাক্কুর/তাদাব্বুর (চিন্তা ও গভীর পর্যবেক্ষণ): আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি, তাঁর নিদর্শনাবলী, কুরআনুল কারীমের আয়াতসমূহ এবং দুনিয়া ও আখেরাত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা।
*
পদ্ধতি: রাতের বেলা, ফজর বা যেকোনো নির্জন মুহূর্তে প্রকৃতির বিশালতা, মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা, নিজের সৃষ্টি এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবন নিয়ে চিন্তা করা। কুরআনের আয়াতের অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে গভীরভাবে ভাবা।
*
উদ্দেশ্য: ঈমান বৃদ্ধি, আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি এবং হেদায়েত লাভ।
3.
মুরাকাবা (আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব): এটি মূলত তাসাউফ বা আত্মশুদ্ধির একটি পদ্ধতি, যেখানে বান্দা নিজের মনকে আল্লাহ তায়ালার দিকে নিবিষ্ট করে এবং অনুভব করার চেষ্টা করে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন বা সে যেন আল্লাহকে দেখছে (ইহসানের স্তর)। এটি ধিকির ও তাফাক্কুরেরই একটি উন্নত রূপ।
*
পদ্ধতি: স্থির হয়ে বসে মনকে দুনিয়ার সব চিন্তা থেকে মুক্ত করে শুধু আল্লাহ তায়ালার প্রতি নিবদ্ধ করা। এই সময় আল্লাহকে হাজির-নাজির মনে করে তাঁর মহিমা ও নিজের দুর্বলতা নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।
*
উদ্দেশ্য: আল্লাহর প্রতি একাগ্রতা, আত্মপর্যালোচনা, পাপ থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা বৃদ্ধি।
4.
সালাতে খুশু (নামাজে বিনয় ও একাগ্রতা): যখন একজন মুসলিম পূর্ণ খুশু ও একাগ্রতার সাথে নামাজ আদায় করে, তখন এটিও এক প্রকার গভীর আত্মিক ধ্যান হিসেবে কাজ করে। নামাজের প্রতিটি অংশ, প্রতিটি শব্দ ও তার অর্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা।
*
পদ্ধতি: ধীরস্থিরভাবে ও মনোযোগ সহকারে নামাজ আদায় করা, প্রতিটি দোয়ার অর্থ নিয়ে ভাবা এবং আল্লাহ তায়ালার সামনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করা।
*
উদ্দেশ্য: নামাজের মূল উদ্দেশ্য অর্জন, মানসিক ও আত্মিক শান্তি।
যেসব মেডিটেশন জায়েজ নয়:
যে কোনো মেডিটেশন পদ্ধতি, যা শিরক, কুফর, বা ইসলাম-বিরোধী কোনো বিশ্বাস বা কার্যকলাপে জড়িত, তা মুসলিমদের জন্য জায়েজ নয়। যেমন:
- অন্য ধর্মের উপাসনার সাথে জড়িত মেডিটেশন।
- আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো সত্তা বা শক্তির ধ্যান।
- শরিয়তের কোনো বিধান লঙ্ঘন করে এমন মেডিটেশন।
রেফারেন্স:
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"যারা ঈমান আনে, তাদের অন্তরসমূহ আল্লাহর স্মরণে প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।"
(সূরা রা'দ, ১৩:২৮)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে দেখায় যে আল্লাহর স্মরণ (ধিকির) মানসিক শান্তি ও প্রশান্তির মূল উৎস, যা ইসলামী ধ্যান বা মেডিটেশনের মূল লক্ষ্য। এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে একজন মুসলিম জাগতিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং আত্মিকভাবে উন্নতির পথে অগ্রসর হতে পারে।