আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ। আপু আমার বোনের স্বামীর সাথে বনিবনা হয়না এজন্য বছর খানিক আগে চলে আসছে। এরপর আমার দুলাভাই বারবার বলে তালাকের কাগজ পাঠায়া দাও যদি না আসো। আমাদের দিক থেকে তালাক চায়নি কেউ। তাদের দিকে থেকে তালাক দিতে বললে বলেছে, আমি তালাক দিব না। তোমারই দিতে হবে। আইনি ঝামেলায় যাওয়ার ভয়ে হয়তো স্ত্রীর দিকে থেকে তালাক চাইছে। এরপর বারবার তার ভাইবোন এবং সে নিজে তালাকের জন্য প্রেসার দিয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত আমার বোন যখন তালাকের নোটিশ পাঠাইছে। এখন তারা আবার নিয়ে যেতে চাচ্ছে। বলতেছে স্ত্রীর তো তালাক দেওয়ার নিয়ম নাই। কিন্তু সে নিজেই তো অনুমতি দিয়েছে। সেক্ষেত্রে কাজির কাছে তিন তালাকে বায়েন উচ্চারণ করছে আমার বোন। আমার বোন আর ফিরতে চায় না। তবুও আমাদের ফতোয়া জানতে চাই
ওয়ালাইকুমুস সালাম। নিচে হানাফী শাস্ত্রে যদি-ও-খাই/কিতাব ও কোরআনের নম্বর উল্লেখ করে সংক্ষেপে ফতাওয়া দেওয়া হলো:
কোরআন ও কিতাবীয় প্রবচন
- কোরআন: সুরা তলাক (65:1-2)– তালাক ও তার শর্তাবলী সম্পর্কিত নির্দেশনা। (সূত্র: আল-কুরআন, সূরা তলাক 65:1-2)
- কোরআন: সুরা বাকারাহ (2:229)– তালাক দু’বার ও তৃতীয়বারের পর বিধান সম্পর্কে উল্লেখ। (সূত্র: আল-কুরআন, সূরা বাকারাহ 2:229)
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী মূল বিষয়সমূহ (কিতাব-সূত্র: আল-হিদায়াহ; রদ্দুল-মুখতর/ইবন আবীদীন — Kitab al-Talaq-এর অংশে আলোচনা)
1) তালাক দানের ক্ষমতা কাদের আছে
- হানাফী মতানুযায়ী সাধারণত তালাক কবুলযোগ্য ক্ষমতা স্বামীর হাতে থাকে; স্ত্রী নিজে থেকে “আমি তালাক দিলাম” বললে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ তালাক হিসেবে গণ্য হয় না, যদি না স্বামী তাকে পূর্বেই এই ক্ষমতা (تَفْوِيض — tafwīḍ) দেখাতে দিয়েছেন বা আইনগতভাবে ఆమెকে তালাক দেওয়ার অনুমতি দুচ্ছিন্নভাবে দেওয়া থাকে। (সূত্র: Al-Hidayah, Kitab al-Talaq; Radd al-Muhtar, Kitab al-Talaq)
2) স্ত্রী নিজে যদি তিন তালাক বায়েন (একসাথে) ঘোষণা করে
- যদি তিনি স্বামীর কাছ থেকে tafwīḍ না পান, তাহলো তাঁর একতরফা ঘোষণাকে সাধারণত হানাফী শাস্ত্রে কার্যকর তালাক হিসেবে গণ্য করা হবে না। যদি tafwīḍ/অনুমতি থাকে, তবে তাঁর ঘোষণাও বৈধ। (সূত্র: Al-Hidayah — باب الطلاق)
3) জবর (ইকরাহ) ও প্রেশার সম্পর্কিত প্রযোজ্যতা
- যদি সত্যিকার জবর (প্রচণ্ড বলপ্রয়োগ, ভয়-ভীতি) প্রমাণিত হয়, তাহলে যে ঘোষণাটি জবরের ফলে হয়েছে সেটি বাতিল বলে ধরা হয়। তবে শুধু পরিবার-পরিজনের চাপ/মর্মান্তিক মানসিক চাপ থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে “জবর” হিসেবে গণ্য হবে না; কাজি/শাসনিক তদন্তে প্রমাণ দেখাতে হয়। (সূত্র: Radd al-Muhtar — باب الطلاق و الإكراه)
4) কী করা উচিৎ — প্রাযুক্তিক পরামর্শ (হারফি ফতোয়া নয়, কেবল শরীয় প্রয়োগ)
- যদি বোন আপনারা চান সম্পর্ক ছিন্ন থাকুক এবং তিনি আর ফিরে যেতে চায় না: স্থানীয় ইসলামিক কাযী বা হানাফী ফকীহের কাছে গিয়ে বিষয়টি খুলে বলুন — (ক) তিনি যে ঘোষণা দিয়েছেন তা কি tafwīḍ-সহ ছিল না হলে তা কার্যকর হবে না বলে কাগজী দৃষ্টিতে প্রমাণ করা যায় কি না, (খ) যদি স্বামী/পরিজন নিপীড়ন/অর্থাৎ হক ক্ষুন্ন করে থাকেন তাহলে আদালত থেকে faskh (খল-ত বা বিচ্ছেদ) প্রাপ্তির পথ আছে। (সূত্র: Al-Hidayah; Radd al-Muhtar — باب الفرقة والخلع)
- যদি স্বামী তালাক বা খুলা না নিয়ে চাপ দিচ্ছে, কাযীর মাধ্যমে লিখিত রেকর্ড রাখা ও স্থানীয় শারীয় আদালতে (বা সরকারী ফৌজদারী/বিবাহবিচ্ছেদ আদালতে) আবেদন করা জরুরি। (সূত্র: فقه الكتاب — Kitab al-Talaq)
5) মহবুব কথা
- মাসিক-ইদ্দত, মহর, সন্তানদের হেফাজত ইত্যাদি বিষয়ে রেকর্ড ও আইনানুগ দাবি রাখুন; কাযী/শরীয় আদালত এসব বিবেচনা করে আদেশ দেবেন। (সূত্র: Al-Qur’an 2:228; Kitab al-Talaq)
সংক্ষেপে আপনার বোনের অবস্থান:
- যদি তিনি স্বামীর কাছ থেকে তালাক দেওয়ার অনুমতি (tafweed) পেয়ে থাকেন, তাহলে তার দেওয়া তালাক বৈধ হতে পারে।
- যদি অনুমতি না থাকে, সাধারণ হানাফী অবস্থান অনুযায়ী তার নিজে দেয়া ঘোষণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ তালাক নয়; এ ক্ষেত্রে কাযীর মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই ও প্রয়োজনীয় শারীয়/আইনী কার্যক্রম (faskh বা khula-এর আবেদন) করা উচিত।
- যদি উনি জবর বা অনৈতিক চাপের ফলে তালাক বলেছিলেন, তা প্রমাণ করতে পারেন, তবে সেই বক্তব্য বাতিল করা যেতে পারে — কাযীর তদন্ত প্রয়োজন।
সূত্র (মূল কিতাবসমূহ — উক্ত অধ্যায়সমূহে বিস্তারিত আলোচ্য):
- আল-হিদায়াহ (Kitab al-Talaq — باب الطلاق)
- رَدّ الْمُخْتَار (Ibn Abidin) — Kitab al-Talaq (باب الطلاق)
- আল-কুরআন: সূরা তলাক 65:1-2; সূরা বাকারাহ 2:229
(উল্লেখ্য: এখানে দেয়া নির্দেশনাগুলো সাধারণ হানাফী ফিকহের সারসংক্ষেপ; নির্দিষ্ট মকামি আইন বা কোরাণ-হাদীস-সাহাবী বর্ণনার মর্মে পূর্ণ বিচার করতে স্থানীয় কাজী/হানাফী মুফতিকে সশরীর দেখা করে বিস্তারিত নথিপত্রসহ মামলা উঠাতে বলুন।)
আল্লাহ হিদায়ত করুন।