আসসালামু আলাইকুম
আমার অবস্থান বুঝাতে তিনভাগে সম্পূর্ণ লিখছি।
১###
আমার বাবা একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। আমরা ছোট থেকে কখনো অভাব দেখিনি। ১৯-২০ সালের দিকে আমার বাবার কিছু ঋণ প্রকাশ পায়, ২০ সালে অনেক সম্পদ দিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার ঋন শোধ করা হয় কিন্তু আরো ৫০ লাখের অধিক ঋন এখনো ঝুলে আছে। এবং এই পরিস্থিতিতে আমার পরিবার পালিয়ে বাঁচার মতো বেচে আছে। এরই মাঝে আমার বাবা ২৪ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। ২০২০ সালের পর থেকেই আমরা মারাত্মক অভাব ভোগ করেছি, মৃত্যু পূর্বে আমার বাবা নাইট গার্ডে জব করেছেন। আর আমার মা বাধ্য হয়ে ফ্যাক্টিরিতে কাজ করেন অথচ এরকম অবস্থান আমাদের ব্যাপারে মানুষ কখনো কল্পনাতেও আনতে পারতো না। এমনকি আমার বাবার লাশটাও আমরা আমাদের এলাকায় নিতে পারিনি জেঠা, কাকারা সমর্থন করেননি। লাশ নিয়ে এলাকায় গেলে ওনারা এলাকায় থাকবেন না এমনটা জানালেন। এখনো আমরা অস্বচ্ছল অবস্থায় আছি যার জন্য সংসার চালাতে আমার আম্মুকে কাজ করতে হয়। আমার বড় ভাই আছে কিন্তু সে দায়িত্বশীল না, তার একার উপার্জনে সংসার চলবে না আমার বাবার ঋন শোধতো খুব দূরের বিষয়!
আমি HSC পর অনার্সে ভর্তি হয়েছিলাম কিন্তু কঠোরভাবে পর্দা করার উদ্দেশ্যে আর কনটিনিউ করিনি। সেখানে সহশিক্ষা যদিও আমার রেগুলার ক্লাস করা লাগতো না শুধু পরীক্ষা দিতে হতো, কিন্তু ছবির ব্যবহার, বাসে যাতায়াত ইত্যাদি দেখে আমার দীলে মানে নাই, আল্লাহর দিকে পরিপূর্ণ ফেরার জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দেই। বিশ্বাস করতাম আল্লাহর জন্য কিছু ছাড়লে আল্লাহ আমাকে এর চেয়েও উত্তম কিছু দিবেন। আমি এখন মহিলা দ্বারা পরিচালিত এক মাদরাসায় চাকরি করি, যেখানে সারাদিন খেটে ৩/৪ হাজারের মতো বেতন পাই। সার্টিফিকেট থাকলে হয়ত আমি এর থেকে ভালো কিছু ইনকাম করতে পারতাম যেটা আমার জরুরত।
আমি জানতে চাচ্ছি, আমার এই জরুরতে তথা পরিস্থিতিতে আমার জন্য সহশিক্ষায় অধ্যয়ন করা জায়েজ হবে কিনা। সহশিক্ষায় অধ্যয়ন করা জায়েজ হয়ে থাকলে,যেহেতু তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে ছবি জমা দিতে হয় এবং কিছু পরিস্থিতি যেমন পরীক্ষার হলে মুখ দেখাতে হয়। ছবি জমা দেওয়া এবং কিছু পরিস্থিতিতে মুখ খোলে দেখাতে হলে সেটা আমার জন্য জায়েজ হবে কি না।
২###
আমার পরিবারে ছোট থেকেই ঝগড়া অশান্তি বিদ্যমান। আমি ছোট থেকেই দীর্ঘ বিষন্নতায় ভুগেছি। আমার পরিবার আমার পর্দা পছন্দ করেন না। পর্দা ধরার জন্য আমি শারীরিক মানসিকভাবে বহু জুলুমের স্বীকার হয়েছি, তারা আমাকে বিয়ে দিতে চান, কারণ আমার বোঝা তথা ভরণপোষণ ওনারা বহন করতে পারবেন না। কিন্তু আমার জন্য দ্বীনদার পাত্র ওনারা খুঁজে পান না। ওনারা বিশ্বাস করেন না, এমন পর্দা করে কারো বিয়ে হওয়া সম্ভব না! আমার আত্মীয় স্বজনরাও কেউ বিশ্বাস করেন না এমন পর্দা করে আমার কখনো বিয়ে হবে! ওনারা কেউ হুজুর না তাই আমার জন্য হুজুর এনে দিতে পারবেন না। ছবি না তুলা,পর্দা করার জন্য, বেদ্বীন পাত্রের ব্যাপারে রাজি না হওয়ার জন্য, আমি এই ২২ বছরের জীবনে অনেক মার খেয়েছি। এই বিয়ে সংক্রান্ত বিষয়ে আমি ছবি তুলতে রাজি না হওয়ার জন্য আমার বাবা আমাকে শেষবার তখন মেরেছিল যখন তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন, খাদ্যনালী শুকিয়ে অভুক্ত ছিলেন ১/২ মাস। নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেয়েছিলেন, আমি যেন ছবি তুলি পর্দা ছাড় দেই, বিয়ে করি। গ্যাসের পাইপ দিয়ে আমাকে এতটা মেরেছিলেন আমার শরীরের আঘাতের জায়গাগুলো কালো হয়েছিল, হাতগুলো এতটাই ফুলে ছিল যেন মুঠো করলেই ফেটে যাবে নাড়াতে কষ্ট হত , চামড়া এমন ছিল যেন পুড়ে গেছে, ছিলে গেছে , ঘাড়, পিঠে, অবস্থা এমন ছিল আমি ব্যাথায় ঠিকভাবে ঘুমাতে পারতাম না। ব্যাথা ছিল অনেক দিন আল্লাহ তাকে মাফ করুক, আমার পরিবার আমার শত্রু না, দুনিয়াতে কেউ যদি আমার কল্যাণ চেয়ে থাকে তাহলে তারাই চেয়েছেন, তাই আমি তাদের মাফ করবো। তারা আমায় বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলে, বের না হওয়ার জন্যও আমার পরিবার মেরেছেন। আমিতো শারীরিক মানসিক আঘাতে সবর করতে পারি। কিন্তু তারা আমাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। তাদের বাড়িতে পর্দা করে থাকা যাবে না। পর্দা করলে তাদের বাড়িতে থাকা যাবে না। তারা মারতে চায় না আমি যেন বেড়িয়ে যাই তাদের ঘর থেকে। আর এখনতো আমার বাবাও দুনিয়াতে বেচে নেই তাদের ঘরে থাকার অধিকার চাইবো কার কাছে! এমনকি আমি ২ বার মাদরাসাতুল মাদীনায় যোগাযোগ করেছি, কখনো বোন বা কখনো দায়ী ভাইদের পরামর্শে কিন্তু বরাবরের মতো মাদরাসাতুল মাদীনা নওমুসলিম ব্যাতীত কাউকে সাহায্য করেন না এমনটাই জেনেছি। যাইহোক আহলিয়া থেকে শুরু করে অনেক মাধ্যমেও আমি বিয়ের ফিকির করেছি, শায়েখ হারুন ইজহার এবং ওনার ওয়াইফের শরণাপন্ন হয়েছি, বায়োডাটা দিয়েছি সাহায্য চেয়েছি কিন্তু কেউই মনে রাখেননি। মামুনুর রশিদ কাসেমীর মতো ব্যাক্তিরও শরণাপন্ন হয়ে দুনিয়ার বাস্তবতা দেখেছি। আল্লাহর ফয়সালা আসেনি। কেউই সাহায্য করেনি। আমার অর্থনৈতিক ক্রাইসিস শুনেও অনেকে রিজেক্ট করেছে।
আমি যদি নিজেকে জোর করে যে কাউকে বিয়ে করতে পারতাম, এত কিছু সহ্য না করে সহজেই বিয়ে করে নিতাম, লড়েছি নিজের সাথে পারিনি, অপছন্দের কাউকে বিয়ের চেয়ে মৃত্যুকে বরণ করা আমার জন্য সহজ, হয়ত এখানে কিছু মানসিক ট্রমার মতো বিষয় আছে কিন্তু এটা আমার হাতে নেই।
### ৩
আমার আমলি, ইমানী হালত এখন শেষের দিকে, যখন আমি মুখ ঢেকে পর্দা করতাম না সে সময়টায় আল্লাহর সাথে আমার সম্পর্ক অনেক মজবুত ছিল, আমার ইমানের স্বাদ ছিল। কিন্তু কিন্তু দিন আমার কাযা সালাতের সংখ্যা বাড়ছে। যা কোনোভাবেই আমি পূরণ করতে পারছি না, বিয়ের জন্য আমল খুব দূরের বিষয় আমার ফরজ আমলও ঠিকভাবে পূরণ হচ্ছে না। উপরে যা লিখেছি এর কোনোটাই আমার দুঃখ কষ্টের মাঝে নেই। আমার পরিবার অশ্লীল গালাগালাজ করেন। যা কোনো কান সহ্য করতে পারবে না ! বাপ ভাইয়ের ধর্ষনের গালি শুনি! মা স*ন বলেন। কোনোকালেই ঘরের মাঝে শান্তি ছিল না, এই গালিগালাজ, মারধর ছোট দেখে ঘরে দেখেছি, জীবনের কিছু সময় আমি এতটাই বিষন্নতায় ভুগছি যে অধিকাংশ সময় ঘুমিয়ে কাটিয়েছি, একটা সময় বেচে থাকার জন্য আল্লাহকে বেছে নিয়েছি,খুঁজে পেয়েছি। যদি আত্মহত্যা জায়েজ হত মানুষের কাছে মানসিক এই যন্ত্রণা ব্যক্ত করার চেয়ে আমি কবরের অন্ধকারকে বেছে নিতাম। আমি খুব যন্ত্রণা অনুভব করি,যেন আমি শ্বাস নিতে পারছি না আমি মাদকাসক্তের ন্যায় জীবন -যাপন করছি। আত্মহত্যার আকাঙ্ক্ষা করি। সব থেকে বড় বিষয় আমার মা নোংরা অশ্রাব্য ভাষায় আমাকে গালি দিতে থাকলে আমি তার গায়ে হাত তুলি, তার গালি আমার কানে এখন সহ্য হয় না । আমার ছোট বোনকে মারি, জুলুুম করি। আমার মানসিক হালাত এখন ঠিক এমন যেন আমি মানুষ হত্যা করতে পারি।
আমি জানি না আমার কী করণীয়। আমার বাবা বারযাখের জিন্দেগীতে আছেন লাখ লাখ টাকার ঋন রেখে। আমি কীভাবে এই ঋন পরিশোধ করবো। আমি কি জীবন সহজ করতে মুখ ঢেকে পর্দা ছেড়ে দিবো? সহশিক্ষায় ফিরে যাবো? দ্বীন নেই পর্দা মেইন টেইন করতে দিবে না, এমন প্রস্তাবে রাজি হয়ে পর্দায় ছাড় দিবো?
আমার প্রায় সম্পূর্ণ পরিস্থিতি ব্যক্ত করলাম অনুগ্রহ করে আমার করণীয় জানালে এবং জায়েজ কী কী হবে জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।